- দেশত্যাগ করেছেন অনেকেই
- ঢাকায় নিষ্ক্রিয় বেশির ভাগ নেতাকর্মী
- ঢাকার বাইরেও নেতাকর্মীরা একেবারে নিশ্চুপ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তোপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে গতকালই দেশ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পাড়ি জমিয়েছেন। এখন অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ। দেশের এই পরিস্থিতিতে দলটির হাল কে ধরবেন তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো আলোচনা রয়েছে। এ দিকে দলীয় ও সরকার প্রধান শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ায় কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই হতাশ হয়ে ফোন বন্ধ করে রেখেছেন। অন্য দিকে দিশেহারা হয়ে মুষড়ে পড়েছেন তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের করণীয় এবং নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনার বিষয়ে জানতে গতকাল বিকেলে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব:) ফারুক খান ও ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে কল দিলেও তারা রিসিভ করেননি। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ অন্তত এক কুড়ি কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। অবশ্য মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ এক নেতা এ প্রতিবেদককে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দলের হাল কে ধরবেন এবং নেতাকর্মীদের করণীয় কী হবে সে বিষয়ে এখনো নতুন কোনো নির্দেশনা নেই। তবে শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতার সাথে আলাপ হয়েছে। তারা আপাতত চুপ থাকা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দলের অবস্থান তুলে ধরার মাধ্যমে স্পষ্ট করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন সময়ের ব্যবধানে ধাপে ধাপে এগিয়ে সরকার পতন আন্দোলনে রূপ নেয়। ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের শুরুর দিকে নমনীয়তা দেখালেও আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পেলে সরকারি দল রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে গেলেই বাধে বিপত্তি। শেষতক দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করায় টালমাটাল হয়ে পড়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। প্রশাসনের ওপর ভর করে অতীতের সরকারবিরোধী আন্দোলনে সফলতা পাওয়া এ দলটি চলমান ছাত্র আন্দোলন মোকাবেলা করতে গেলেও একেবারে মাঠে দাঁড়াতেই পারেনি। আন্দোলন দমনে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলারক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী এবং দলীয়ভাবে মোকাবলায় ব্যর্থ হওয়ার পর শেষমেশ সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা রেখেছে সিদ্ধান্তহীনতায় থাকা দলটির হাইকমান্ড।
আওয়ামী লীগ সূত্র বলছে, টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত তৃণমূল। সমাধানের উদ্যোগ নিলেও স্থানীয় মন্ত্রী-এমপিদের বলয় প্রভাবে সেই উদ্যোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগেও একই অবস্থা। সম্প্রতিও দেখা গেছে, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের থানা-ওয়ার্ডের খসড়া তালিকা দলীয় প্রধানের কাছে জমা দেয়ার পরই পদবাণিজ্যের বিষয়টি সামনে চলে আসে।
দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা মনে করেন, ক্ষমতায় থাকার সুবাদে আওয়ামী লীগে সুবিধাবাদী লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ওই সুবিধাবাদী লোকজন যখন দলের বিভিন্ন পদে আসীন হয়ে ফুলে ফেঁপে কলাগাছ হয়েছে তখন দলের বিপদে তারা ঘর থেকে বের হননি। আরেকটি বিষয় হলো ছাত্রদের আন্দোলন ছিল একটা যৌক্তিক দাবি নিয়ে। হাইকমান্ড এটা বুঝতে অনেক দেরি করেছে। তারপরও ছাত্রদের এই আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে যাওয়া ছিল মারাত্মক ভুল।
যখনই ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়েছে তখনই উপলব্ধি করা উচিত ছিল এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন ছিল। পুলিশের মাধ্যমে সাধারণ ছাত্রদের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে সরকার এক দিকে দেশীয়-আন্তর্জাতিক চাপে ছিল। অন্য দিকে আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করায় তৃণমূল নেতাকর্মীরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। একসময় কেন্দ্র থেকে নির্দেশ দিলেও রাজপথে দলের একটি অংশ মাঠে নামলেও নিষ্ক্রিয় থেকেছে বেশির ভাগ। তা ছাড়া দলের এই দুঃসময়ে মন্ত্রী-নেতাদের বিদেশ যাওয়ার হিড়িকের খবর ছড়িয়ে পড়লে অন্যরাও শেষমেশ নিজেদের রক্ষা করতে রাজপথে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
এমনকি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে অলিতে-গলিতে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান করে আন্দোলন প্রতিরোধ করার নির্দেশ দিলেও বেশির ভাগ নেতাকর্মী ঘর থেকেই বের হননি। আর যেসব নেতাকর্মী রাজপথে প্রতিরোধ করতে গিয়েছেন ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ় মনোবলের কাছে তারা টিকতে পারেনি।



.png)
