বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে হত্যা ও সহিংতায় উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। গণগ্রেপ্তার বন্ধেরও দাবি জানিয়েছে তারা। একই সঙ্গে তারা এই সব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিচার দাবি করেছে।
চলতি সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের সঙ্গে ‘অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি” আলোচনা স্থগিত করেছে ।
সেপ্টেম্বরে নতুন অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরুর কথা ছিল। ইইউর পররাষ্ট্র বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ জোসেফ বোরেল ফন্টেলেস ৩০শে জুলাই এক বিবৃতিতে আলোচনা স্থগিত রাখার কথা জানান।
অন্যদিকে ৩০ জুলাই ঢাকায় জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্র্যোস্টার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে দেখা করে ঘটে যাওয়া সহিংসতা ও প্রাণহানির তদন্তে জার্মানির সহযোগিতার ইচ্ছার কথা জানান। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘কোটা সংস্কার আন্দোলনের সুষ্ঠু ও মানসম্মত তদন্ত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির জন্য বিদেশি প্রযুক্তিগত সহায়তা নেয়া হবে।” বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মো. নাঈমুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনও তদন্তে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
বুধবার প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তদন্তে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ," আমরা জাতিসংঘের কাছেও আবেদন করেছি। আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে দেশে-বিদেশে, তাদের কাছেও আমরা সহযোগিতা চাই যে, এই ঘটনার যথাযথ সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং যারা এতে দোষী, তাদের সাজার ব্যবস্থা হোক।”
জানা গেছে, সরকার তদন্তে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে টেকনিক্যাল সহায়তা নিতে চায়।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংবাদ মাধ্যম এ পর্যন্ত ২১০ জন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে। আন্দোলনের সময় সরকারি সম্পদেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকার আদালতের নির্দেশনায় এরই মধ্যে কোটা সংস্কার করলেও আন্দোলনকারীরা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বলছেন, " যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে তার বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোল চালিয়ে যাবেন।”
সরকার এই ঘটনায় প্রথমে এক সদস্যের একটি বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশর করলেও পরে তার সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে তিনজন করা হয়েছে। কর্মপরিধিও বাড়ানো হয়েছে। তারা এখন ১৬ জুলাই থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত যারা নিহত হয়েছেন, তাদের মৃত্যুর কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করবেন। আগে তাদের শুধু ১৬ জুলাই ছয়জন ছাত্রের নিহত হওয়ার ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া দেয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
জাতিসংঘ এই ঘটনায় কয়েক দফা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সর্বশেষ প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক এক ব্রিফিংয়ে কোটা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, "মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যধিক বলপ্রয়োগের বিষয়ে সামনে আসা নানা প্রতিবেদনের বিষয়েও তিনি শঙ্কিত।”
তিনি বলেন, ‘‘যে-কোনো পরিস্থিতিতে প্রয়োজকোটা সংস্কইউরোন হলে জাতিসংঘ মহাসচিব তার ম্যান্ডেট অনুসারে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফরেন পলিসি প্রধান জোসেপ বোরেল বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের' নিন্দা জানিয়েছেন। বোরেল এক বিবৃতিতে বলেন, "বিক্ষোভকারী ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অসংখ্য ঘটনাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।” তার কথা, "মৌলিক অধিকারের প্রতি পুরোপুরি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হবে।”
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে বিক্ষোভকারীদের ওপর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, হতাহতের ঘটনা, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনে গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন। এমন ঘটনায় হতাহতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং স্বচ্ছ তদন্ত চায় সংস্থাটি। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে লেখা চিঠিতে ওইসব কথা বলেছেন। তিনি তার চিঠিতে চলমান সংকট নিরসনে বাংলাদেশকে সবরকম সহায়তা প্রস্তাব করেন। সেখানে তিনি কোটা আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর স্বচ্ছ তদন্তের তাগিদ দেন।



.png)

